Friday, May 21, 2021

নাসেরের কবিতার স্বাদ-আস্বাদন

 লিখেছে

উ জ্জ্ব ল  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় 

ছবি ইন্টারনেটের সৌজন্যে প্রাপ্ত

যে-লেখা প্রকাশিত হয় তা সকলের জন্যে তার গোপনীয়তা থাকে না আর তা পাঠ করে যে-ভাবনা দানা বাঁধে তার আনন্দ একা-একা ভোগ না করে অংশভাগের ইচ্ছাটাও কোনো ধৃষ্টতা নয় সে-কারণে গঙ্গাজলে গঙ্গা পুজো করার মতোই নাসেরের কবিতায় এই নাসের বন্দনা পাঠকের মনোযোগ পেলে বাধিত হব

ডাক

খুব সহজ-সরল করে, খুব পরিচিত শব্দবন্ধে কবি নাসের প্রকাশ করেছেন কাব্যিক ব্যঞ্জনা আসলে কবিতার শব্দবন্ধ যাই হোক না কেন, বাক্যবন্ধে যতই চমক থাকুক না কেন, নির্মাণ বা গঠনগত বৈচিত্রে যতই মুনশিয়ানা থাকুক না কেন, তার আবেদন অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করে সেই দুর্লভ বিষয়টি হলো তার ব্যঞ্জনা দুর্লভ বলছি এই কারণেই যে ব্যঞ্জনা তৈরি করা যায় না - তা ব্যঞ্জিত হয় তাই তার সহজলভ্যতা নেই এখানে কবি পশ্চিমাকাশের অস্তমিত সূর্যের বিদায়লগ্নটিকে ধরতে চেয়েছেন খুব স্বল্প পরিসরে সে কেবল একটি সূর্যাস্তের বর্ণনা নয় যেখানে অস্ত-আসন্ন সূর্য ও পশ্চিমাকাশের লালিমা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়ে হয়ে থাকছে না নিসর্গ থেকে বিদায় ঘন্টা বেজে উঠতেই মানব জীবনের সর্বজনীন লীন-বেদনা কেমন সুন্দরভাবে ব্যক্তিক চেহারায় নৈর্ব্যক্তিলাভ করল, ‘এইবার কষ্ট শুরু হল প্রকৃত সে-কষ্টটা কীসের? কষ্ট ঠিক নয় - সারাদিনের ব্যস্ততার অবকাশে দেখা হয়নি যে-সব চিঠি তাদের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো এখন গুরুত্ব মাফিক দরকারি হয়ে উঠবে, অথবা অদরকারি বলে তাকে ছিঁড়ে ফেলা হবে প্রস্রবণ যেন জলীয়বাষ্প অথবা অশ্রুর সমার্থক যা উষ্ণতায় ভরে ওঠে না, কৃতজ্ঞতা আরও আর্দ্র হয়তা উষ্ণতায় উবে যায় - বাষ্পীয় হয় এক ধরনের বেদনাবোধ, শূন্যতা, এক ধরনের মেলানকলি সময় এখানে কিছু জ্ঞাপন করে প্রত্যক্ষতসময়জ্ঞাপক ঘড়ির অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবাসা-প্রেম-বিরহ খুব নতুন শব্দ নয় তাও তার ব্যবহারে কবি বেশ সপ্রতিভ ঘড়ি কি ভালবাসার তড়িঘড়ি দ্রুততার পরিমাপক শব্দ? হতে পারে তবু তার ব্যাখ্যা নিয়ে কবিতার বোধে কোন অসুবিধা ঘটায় না আর কবির সেই ভালবাসার গভীর প্যাশন আক্রোশ হয়ে ধরা পড়ে, যদিও আক্রোশ এখানে পাঠকের অপছন্দের শব্দ হতেও পারে কবির মনোগত শবব্যবচ্ছেদ এই অংশটিকে ইন্দ্রিয়ঘন, শরীরী করে তুলেছে মুহূর্তের নিসর্গ - চলে যাওয়ার শেষ যন্ত্রণাটুকু যেন টেনে বের করে আনল কবির মনোজগতের ক্যানভাসে লেগে গেল বিদায়ের বিষন্ন রঙ প্রতিদিন ওই একই বিদায়-বিষন্নতা, প্রতিদিন ওই একই চলে যাওয়া, প্রতিদিনই স্মরণের, মরণের নির্বাচনী রুটিন ব্যস্ততা কবির ব্যক্তিক অনুভূতি এখানেই যেন পাঠকের হৃদয়ে বিদায়-রাগের অনুভবি বিস্তার ঘটিয়ে দিয়েছে

সুসামঞ্জস্যময়

কবিতাটির প্রাথমিক পাঠ আমাকে অমিয় চক্রবর্তীর মেলাবেন তিনি, মেলাবেনকবিতার ভাবনায় টেনে নিয়ে গেল সেই দর্শনটি যেন অন্যভাবে পেলাম নাসেরের কবিতায় চারপাশের সবকিছুই যে মনোমতো হচ্ছে তা নয়, যা চাইছি তাই ঘটছে - তাও নয় একেবারে বেসুরেই যেন বাজছে তবু মৌলিক দর্শন বলছে যে সুরহীনতা বলে কিছু নেই যা আপাত বেসুরো তা আপাতই বটে যা সুরেলা নয় - তার থেকেই নতুন সুরের জন্ম হচ্ছে বলেই তা আর বেসুরো থাকল না সুর ছিল বলেই অন্য সুর জন্মায় এমন তো নয় - যে বেসুরোই সুর যাবতীয় বিশৃঙ্খলা, যাবতীয় অসুর-কুশ্রীতা, অসামঞ্জস্য বিপরীত প্রক্রিয়ায় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক এক মহাসত্য এই কবিতায় নতুন করে উঠে এসেছে সংঘর্ষ বা বিরোধ থেকে যে-ক্ষয় তৈরি হয় তাই সঞ্চিত হতে-হতে আবার নতুন সৃষ্টিকে স্বাগত জানায় ধ্বংসটা শেষ কথা নয় তার ভেতরেই থাকে নতুন সৃষ্টির প্রেরণা জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা মনে পড়ছে – ‘সৃষ্টির মনের কথা, মনে হয় দ্বেষ তাই অসামঞ্জস্য থাকবেই - তার ভেতর থেকেই উঠে আসবে নতুন সামঞ্জস্য রবীন্দ্রনাথও বলেছেনঃ শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্ন শেষ পরে, ওরা কাজ করে মনে পড়ে যাচ্ছে Thomas Hardy-এর কবিতা, ‘This will go onward the same, though dynasties pass’ অথবা ‘War’s annals will fade into the night, “Ere their story die”?’

নাসের তাঁর কবিতাকে গদ্যধর্মী করে রেখেছেননিছকই গদ্যিক অনেকটাই বিবৃতিমূলক যদি পরপর সাজানো যায় - ঠিক গদ্যরচনা যেভাবে সাজে ঠিক সেইভাবেই পদ্য রচনার দায় নিশ্চয়ই তাঁর নয় তবু এই কবিতাগুলো পড়ে, যে-কটি আমার হাতে এসেছে, আমার মনে হয়েছে যে অত্যন্ত গদ্যধর্মী তাঁর এই কবিতাগুলি তাই ক্লান্তিকর, বেশ ক্লান্তিকর দার্শনিকভাব, কাহিনিগতভাব নাসেরের কবিতায় অসম্ভব গুরুত্ব পায় প্রথাগতভাবে কবিতার স্নিগ্ধতা অলৌকিকত্ব তা এখানে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না জাহাজ কবিতায় সিন্ধবাদের কাহিনিটাই যেন পদ্যের বা কবিতার গাঠনিক কৌশলে সাজিয়ে পরিবেশন করা হল সেটা মুক্তগদ্যের ফরম্যাটে সাজালেই বা কী হত?

জাহাজ

জাহাজ যদি যদি কবিতা হয় (-বিষয়ে আমার কবিতার আলোচক হিসাবে কোন ব্যক্তিমত নেই - কেননা একজন লেখক কীভাবে তাঁর বক্তব্যকে উপস্থাপিত করবেন তা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় - কেবল মুদ্রিত অবস্থায় যখন তা সকল পাঠকের আস্বাদনের জন্যে উপস্থাপিত হবে তখন নানা অনুভূতির কথা তাঁকে শুনতে হবে) তাহলে সেই অলৌকিক ভাবনাটি আমরা খুঁজে খুঁজে পাবো না যা কিনা কবিতার কাঠামোয় একটা না-বলা বাণী পৌঁছে দেয় সিন্ধবাদ নাবিকের গল্প, দুর্ঘটনা, ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, সৌভাগ্য, ধনরত্নপ্রাপ্তি, প্রত্যাবর্তন - চোখের জল - আনন্দের মিলিত আবেগের মিশ্রণ গল্পটা আমাদের সকলেরই জানা আমরা কবিতা খুঁজছিলাম, গল্প নয় আসলে উনিশ শতক চলে যাবার পর আখ্যায়িকাকাব্য-মহাকাব্যের জগৎ শেষ করে দিয়েছিল গীতিকবিতা তারপর থেকেই ওই গীতিকবিতারই যুগ রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে জীবনানন্দে তার অন্য ঘনীভূত শরীর দেখল বাঙালি-পাঠক ছন্দটা কিন্তু হারালো না প্রবহমান যাপন হয়ে থেকে গেল অন্তর্লীন কাব্যিক ব্যঞ্জনা যে-কারণে মাটির শিল্পীদের পক্ষে আধুনিক গদ্য কবিতার আবৃত্তি সমানভাবেই জনপ্রিয় থেকে গেল কেবল তাকেও ভাঙার যে-প্রচেষ্টা শুরু হলো পাঁচের দশক থেকে - সেখানকার অহংকার যেন পড়তে পড়তে নাসেরে এসে বিবৃতি কবিতা হয়ে গেল এই কবিতায় কেবল অন্যের সমারোহ, ঘটনার ক্রমিক বিবরণ তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক কোনও অর্থেই কবিতা পেলাম না পদ্য পেলাম এর পাশাপাশি যখন আধুনিক কোন কাহিনিচিত্রে ততোধিক আধুনিক গান শুনছি, ‘এই জাহাজ মাস্তুল ছারখার, তবু গল্প লিখছি বাঁচবার’, যেখানেও ছন্দ পাচ্ছি - কোথাও যেন একটা দোলা অনুভব করছি জাহাজ নিয়ে নিতান্তই গদ্যধর্মী আলোচনায় আমি আলোচক হিসেবে একটু বিব্রত বোধ করছি

তিনি বলেছিলেন

কবিতা যখন জ্ঞানগর্ভবাণী প্রচার করে তখন তাকে কবিতা বলা যাবে কিনা এ-বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারলেও সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারব না ‘তিনি বলেছিলেন’ কবিতাটি সম্মাননীয় শ্রদ্ধেয় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ কে কেন্দ্র করে লেখা ১২১ লাইনের কবিতা সাল ২০১৯, তারিখ ১৩ই নভেম্বর হল রচনাকাল সেখানে যে-উপদেশ দেওয়া হয়েছে, জীবনযাপন ও জীবনচর্চার যে-আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে, যে-সব আচরণীয় বা পালনীয় নীতি-নির্দেশ করা হয়েছে তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠবে না সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবসভ্যতার আদর্শ কল্পনা তো এইসব নবী-মনীষীরাই করে গেছেন নাসের অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে নিছক কথোপকথনের ভঙ্গিতে তা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের মত পার্থিব কামবাসনা ও মোহে অন্ধদের জন্যে এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতেই হয় স্বর্গ কোথায়? মায়ের চরণে সবচেয়ে পুণ্যস্থান কোনটি? মায়ের চরণ নারী সম্মাননীয়া নারী-পুরুষ পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের ভেতর দিয়েই সম্মানিত হবে প্রত্যেকেই অনন্ত সম্ভবনা নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে প্রত্যেকের ভেতরে আছে মহানুভবতা তারা সকলেই আপন-আপন ধর্ম পালন করবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহিষ্ণুতার ভাব বজায় রাখতে হবে দান-ধ্যান করতে হবে, ইন্দ্রিয়সংযম অনুশীলন করতে হবে, শৈথিল্য - তা চারিত্রিক হোক বা নৈতিক ত্যাগ করতে হবে। লোভ-লালসা কামনা-বাসনাকে দমন করতে হবে অসহিষ্ণুতা, হিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা, আক্রোশ দূর করতে হবে হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, জাতিদাঙ্গা ও ভ্রাতৃদাঙ্গা থেকে দূরে থাকতে হবে

এইভাবেই নাসিরের কবিতায় সেই পরম পুরুষ ও পরমগ্রন্থেরই সারাৎসার উঠে এসেছে একেবারে গদ্যে লেখা নিছকই ধর্মবাণী এখানে কাব্যের ব্যঞ্জনা খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন এই কবিতা লেখার যে-গভীর প্রয়োজন কবির মধ্যে এসেছিল, সেই বোধটাই একে মানবপ্রেমের জীবনরসে জারিত করেছে এভাবে বললেই যেন সঠিক বলা হয় আমি বলতেও চাই সেইভাবেই আজ পৃথিবীতে মানুষে-মানুষে যে সম্পর্কের অবনতি, সংকীর্ণ জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের যে-লড়াই চলছে, বৃহৎ শক্তির দাবিদারিত্বে যে-অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা বিশ্বজুড়ে - মানবাধিকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, সেখানে উপদেশ কতটা কার্যকরী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে জানি, Preaching can do nothingতবু মানুষের সদর্থক প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে উপদেশ এর প্রয়োজন আছে এই কবিতায় নাসের সেই পরিত্রাণের বাণী পৌঁছে দিতে চেয়েছেন কেননা কবিরা পরিত্রাতাদেরই একজন, পথপ্রদর্শক, আলোকদিশারী সত্যের বাণী তো অমৃতময় বটেই নবীর মানবিক জীবনভাবনা, তাঁর মৈত্রীভাবনা, বিশ্বমানবাত্মার মর্যাদা রক্ষার স্বপ্ন যেন কবির লেখনীর মধ্যে দিয়ে মানুষের হৃদয় সজ্ঞাত হচ্ছে শুভভাবনা, মাঙ্গলিকভাবনা যে মাধ্যমেই আসুক না কেন - তার পৃথক মূল্য আছে সেই মূল্যের বিচারে এ-কবিতাও তাই সচেতনতভাবে সার্থক

কবিতার সমালোচনা মানে কবির দোষত্রুটি বের করা নয় ছিদ্রান্বেষণ নয় অভিভাবকত্ব ফলানো নয় তার চেয়ে অনেক কাজের হল - তা সাহিত্য মাধ্যম হিসেবে আলোচ্য ক্ষেত্রে কতদূর ব্যাকরণসম্মত বা কতটা উত্তীর্ন তা দেখা ও দেখানো পাঠক নিজে যা বোঝেন তার সঙ্গে যদি অন্য পাঠকের সমালোচনার উদ্দেশ্য বোঝেন, তাহলে তা একটু মিলিয়ে নেওয়া যায়, তাহলেই কবিতার পাঠ অর্থগত দিক থেকে সম্পূর্ণ হয় সেই চেষ্টাই করেছি তবু ভরিল না চিত্ত কবিতার যে-ন্যূনতম ব্যাকরণ সূত্রগুলি থাকে তা আমার পঠিত, যদিও শেষ রচনাটিতে তার তত পাইনি তবে তা আমারই দুর্ভাগ্য বটে পরবর্তীতে তাই আরও নাসের পাঠ করার ইচ্ছে থাকল

পুনশ্চঃ নাসেরের আরেকটি কবিতা নিয়ে দু-চার কথা

‘দেশ’-এর কবিতা সংকলন(১৯৮৩-২০০৭) ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেলাম নাসের হোসেনের কবিতা ভারতবর্ষ’, একটি রূপকধর্মী কাহিনিপ্রবণ, সহজ-সরল কবিতা দুই ভবঘুরের গল্পটিতে নাটকীয় চমক আছে আছে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-শ্লেষ-রসিকতা আছে রূপকথার আবেশ - যা নাসেরের কবিতায় প্রায় মুখর হয়ে ওঠে কবিতার বক্তা আমিসর্বনামধারী কবি ঘোষিত মুসলমান আর উদ্দিষ্টতুমিহিন্দু দুই ভবঘুরে বন্ধু এই বিষয়টাতে কোনো চমক নেই চমক আছে এই ঘোষনায় যে, আমি মুসলমান আর তুমি হিন্দু অথচআমিচেয়েছিল এই ভারতবর্ষে (যেখানে তারা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছিল) একটা মন্দির বানাতে আরতুমিচেয়েছিল মসজিদ যেন একটা বৈপরীত্য এনে একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়

আমাদের চাওয়াটাই এমন উদ্ভট তারপর দুজনেই কাজের চাপে ভুলে গেল মন্দির-মসজিদের কথা আরও তো অনেক কিছুই করার ছিল তো সেগুলোতেই তারা মন দিল শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান-আলো-পানীয়জল-বিজ্ঞানপ্রযুক্তি, হ্যাঁ, সেই উন্নয়নের মহাযজ্ঞে ঝাঁপ দিল দুজন দুই ভবঘুরে মনুষ্যত্ব নীতি-আদর্শ বিবেক মানবিক মূল্যবোধে মানুষ এখন সেখানে পরিপূর্ণ মানুষ কুসংস্কার দূর হয়ে গেছে অপবিজ্ঞান, অধিজ্ঞান দূর হয়েছে, যুক্তিতর্ক বিচারে সিদ্ধান্ত গ্রহণপর্ব শুরু হয়েছে এখন আর নরক নেই, হয়েছে স্বর্গ এমন সময় দুজনেই গেল সেই জায়গায় যেখানে মুসলমান বানাতে চেয়েছিল মন্দির আর হিন্দু চেয়েছিল মসজিদ তো সেখানে গিয়ে দেখা গেলো -গিয়ে দেখি সেখানে চমৎকার হ্রদে কতরকমের হাঁস খেলে বেড়াচ্ছে/চারপাশের বাগানে কত যে পাখি/ পুরুষ নারী ও বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড়/ জমে উঠেছে তুমুল পিকনিক

চমৎকার ফ্যান্টাসি ইউটোপিয়া সব পেয়েছির দেশ ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ/কোথায় গেলে পাবে কেহ ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে ভারততীর্থকবিরা তো স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন স্বপ্ন দেখান কোটি কোটি নিরক্ষরদের যারা চালনা করে সেই রাজনীতি ও ধর্মব্যবসায়ীরা এই এক সদর্থক পাঠের মর্ম বোঝেনা কার্যত তারা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই পড়েন না পড়েন দু-চারজন সুশীল সমাজের সদস্য তাও তো আবার তাদের মতামত প্রভাবিত গোঁড়া, মৌলবাদীদের দল যা কিনা বুদ্ধিজীবীদেরও দল! এমনই উদ্ভট এই পরিকল্পনা মন্দির-মসজিদ বিতর্কে ওই দাবিদার বৈপরীত্য এমন যদি সত্যি হত, আহা! সত্যি হয় না, কিছুই সত্যি হয় না মূর্খদের আরও মূর্খ বানিয়ে এখানে মুষ্টিমেয় ধান্দাবাজরা আখের গোছায় সেই ফাঁদে পা দেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ

কাহিনির উপস্থাপনা, কল্পনা ও বিন্যাসটি চমৎকার এটাকে একটা অর্ধগল্প ভাবা যেতে পারে উদ্দেশ্যসূচকতা এর সর্বাঙ্গে তাকে চেপে রাখার কোনো ইচ্ছেও কবি দেখাননি মন্দির-মসজিদ নিয়ে অর্থহীন ঝগড়াকে অর্থবহ করে রেখে হাস্যকরভাবে দেশটাকে কয়েক দশক পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে - সেটাই কবি এখানে দেখাতে চেয়েছেন - অবশ্যই রূপকাশ্রিত একটি কাহিনির আড়ালে সদ্ভাবনা, সদর্থক কল্পনার একটি সার্থক প্রকাশ হিসাবে এটি শিক্ষনীয়ও বটে তবে ওই যে, Preaching can do nothing



পেশা আর নেশা যে-মানুষের একই সে নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ। উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় সেই হিসাবে কেবল সুখী তা নয়, বরং সুখস্বর্গে তাঁর বাস। একদিকে পেশা ও নেশা যেমন শিক্ষকতা, তেমনই পক্ষান্তরে কবিতার নেশাও সমান্তরালে বজায় রেখেছেন আজীবন। বহু বিখ্যাত ছাত্রছাত্রীর ভবিষত্যের রূপকার যেমন তিনি, তেমনই কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মননেরও আত্মাকেও ধারণ করেছেন পাঠকসমাবেশে। লেখা ও বইপড়ার জীবনচর্যায় নিবিষ্ট এই কবি-মানুষটির প্রকাশিত বইগুলি হল - কবিতার বই(বিকেলের মুখ ভাসে নদীর জলে,তবু বেঁচে থাকে প্রেম, দুয়ারে তোমার প্রতিভাস,সত্তরের কবিতা,প্রিয়মুখ প্রিয় কবিতা) ও অণুগল্পের বই(পাঁচ মিনিটের গল্প,অণু গল্পের মুখগুলি) 

Tuesday, May 18, 2021

Ground Reality and Management of Uttar Pradesh Against Covid19

Article by

Shikhar Tyagi


UP Covid19

In the second wave of Covid19, novel corona virus speared in a horrendous way in India. Number of patients are increasing incessantly. There is an atmosphere of aghast out there. The entire India become a hotspot of corona virus. Central government of India along with other state governments are showing their stringent endeavor to fight against corona virus. But it is incommensurate because we are the second largest populous country in the world. There are 2, 52,25,159 cases have been registered till May 17, 2021. Out of these patients, 2,15,84,326 patients have been recovered against Covid19. But unfortunately, 2,78,684 people have immolated their lives in the valley of death.  UP is the largest state on the basis of population. Uttar Pradesh have 200 million population. In Uttar Pradesh, there are 16,28,990 total confirmed patients, from them 1,49,032 patients are cured, and 17,817 patients has been waned up to May 17, 2021. But this is according to government’s official data. Ground Reality might be differed from this. I am saying it because there are different aspects on which we should be consentient. For instance, we can consider the number of testing per day. We know that testing of Covid is not taking place up to the level it is needed to be rational. The foremost reason behind this is the smaller number of Static Covid Test per Collection Centres.

In UP, there are only 1260 Covid Test per Collection centres in 75 districts.  In rural areas, conditions are most terrible. For example, twenty-seven people, young and old, have died in the past 40 days in Gagol village of UP's Meerut district, local residents claimed on Friday. District administration officials who reached the village insisted only 15 had died, and "none due to Covid-19". Villagers said it was only recently that officials began taking samples of symptomatic patients. 

"They have now started testing after reports of deaths surfaced in the media. Some samples have been taken and people are being provided with Covid kits," 

one of them said. About the Gagol village deaths, Amit Kumar, block development officer, said, 

"Fifteen people have died due to natural causes and existing illnesses. Samples of 24 people with symptoms have been collected. They have tested negative after the antigen test, their RT-PCR report is awaited." 

As on 10 May, there were 677 Covid cases in Meerut’s rural blocks — Hastinapur had the most (165), followed by Rajpura (102) and Daurala (76). Kharkhauda had 27 cases. Meerut has surpassed all districts of UP in daily Covid infections, deaths and active cases, according to the Covid 19 statistics provided by the state health department for the 24 hours ending May16, 2021. The district clocked 879 fresh cases which is the highest in UP for a day and followed by Gorakhpur at 801 while Lucknow recorded 617 and Ghaziabad 527 cases. Few days ago, UP government launched a web portal for availability of beds in the hospitals. In the Lucknow, there are 3879 beds are available out of 6483 in 73 hospitals. In Agra, there are 1223 beds are available out of 2427 in 34 hospitals. In parliamentary area of our honorable prime minister Mr. Narendra Modi, 1276 beds are available out of 2668 in 61 hospitals. 

In Saharanpur district 291 beds are available out of 643 in 10 hospitals. In Aligarh district 833 beds are available out of 1312 in 15 hospitals. This is situations of big cities, nevertheless people are suffering for beds in hospitals. Our print media, broadcast media, and online media are talking about only the big district. The situation of small and other districts is worst. For example, in parliamentary area of our honorable minister of textiles of India Smriti Irani, there are only two hospitals where local citizen can get treatment for covid-19 and in these two hospitals, there are only total 300 beds. In Badaun, Chitrakoot, Mainpuri, and Siddhart Nagar districts, there is only one hospital available in each district for covid-19 patients. In Amroha, Balia, Lakhimpur Kheri, and Sultanpur districts, there are only two hospitals in each district. In Etawah, Hardoi, Kannauj, Sambhal, and Unnao districts, there are only three hospitals are available for the treatment of covid in each district. In Ambedkar Nagar, Banda, Raebareli (parliamentary area of Mrs Sonia Gandhi), Rampur (parliamentary area of Mr Azam Khan), and Sitapur districts there are four hospitals are available in each district.  In Azamgarh (parliamentary area of Mr Akhilesh Yadav), Hapur, and Shamli districts, there are only five hospitals for the treatment of covid-19 virus in each district. 

India has vaccinated 18,29,26,460 people, but only around 40 million people are fully vaccinated which is 3% percent of vaccinated people. In UP, around 15 million people have been vaccinated yet out of 200 million people which is only 7.5% of total population. That means we still have a long way to succeed.  The situation is so terrible that people have to wait 12-12 hours to Funeral of their family member. This spectacles are not given the eyes a feeling of paradise. But at the end we must cheers to the hope that ‘We shall overcome”. 



Shikhar Tyagi M.Sc. (Statistics) M.Phil. (Statistics) from Uttar Pradesh is currently working as a research scholar at the Department of Statistics, Central University of Rajasthan, Ajmer since August, 2017. Though he is researching in several fields like Probability Theory, Survival Analysis, Parametric Bayesian Inference and Distribution theory, he is a specialist in Frailty Models. He has two research paper publications and two book chapters. His notable work is, "Can the aging influence cold environment mediated cancer risk in the USA female population?" 

Friday, May 14, 2021

হিন্দু ভোটের কতটা কোথায় গেল: 'দ্য হিন্দু'র লোকনীতির সমীক্ষা ও 'দ্য টেলিগ্রাফে'র উত্তর-সম্পাদকীয়

 লিখেছেন 

শো ভ ন লা ল চ ক্র ব র্তী 

Source: The Hindu and The Telegraph

১৯৬৩ সালে ভারতবর্ষের বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী  কোঠারি দিল্লিতে স্থাপন করেছিলেন সেন্টার ফর দ্য স্টাডিজ অফ ডেভেলপিং সোসাইটিস(সিএসডিএস) যার কালক্রমে নতুন নামকরণ হয়েছে "লোকনীতি"। এই সংস্থা বিভিন্ন ধরনের সমীক্ষা সারা বছর ধরে করে থাকেন, এবং তাঁদের বুলেটিনে তা নিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলার ভোটে হিন্দু ভোটের বিভাজন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের একটি রিপোর্ট, যা অনেকটাই ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছে এবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিন্দু ভোটের, বিশেষ করে নিম্নবর্গীয় হিন্দু ভোটের বিন্যাস। এবারের ভোট প্রচারের শুরু থেকে বিজেপি এবং তার পোঁ ধরা কয়েকজন সাংবাদিক একটি নতুন শব্দবন্ধ আমদানি করেছিলেন - তা হল 'নিম্নবর্গীয় হিন্দুত্ব"। এবং এঁরা খুব দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে শুরু করেন যে গ্রামের যাঁরা গরিব, পিছিয়ে পরা শ্রেণী , দলিত ,আদিবাসী প্রভৃতি তাঁরা বিজেপির হিন্দুত্বকে আশ্রয় করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের ধারণার ভিত্তিতে তাঁরা প্রচার শুরু করেন যে ২০১১ সালে এই বর্গের যে মানুষগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন, তাঁরা আজ তৃণমূলের উপর বিরক্ত। কেউ কেউ নিম্নবর্গের মানুষের বিজেপিকে আশ্রয় করার এই ঘটনাকে হিন্দুত্বের এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জয় বলে বর্ণনা করেন, এবং এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন উচ্চ বর্ণের প্রতি নিম্নবর্গের অনীহা ও ক্ষোভ, যেখান থেকে এই ভদ্রলোক বিরূপতার সৃষ্টি। 

এই তত্ত্বকে জোরদার করতে অমিত শাহরা বারবার দলিত ও দরিদ্র ঘরে বসে দিনে দুপুরে রুটিতে ঘি মাখিয়ে লাউকি সবজি দিয়ে লাঞ্চ সেরে বোঝাতে চেয়েছেন, দেখো আমি তোমাদেরই লোক! ভোট পরবর্তী সমীক্ষার ফল দেখাচ্ছে যে নিম্নবর্গের এবং ভদ্রলোক শ্রেণী দুই তরফের ভোটই ২০১৯-এর তুলনায় অনেকটাই চলে গেছে তৃণমূলের ঘরে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপি যে সব শ্রেণীর মানুষের ভোট সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ওবিসি ( যাদব, তেলি, কুর্মি, লোহার, কুমহার প্রভৃতি একত্রিত করে) ভোট , যা ৬৮% থেকে নেমে এসেছে ৪৯% -এ। আদিবাসীদের ভোটও বিজেপি হারিয়েছে, সেখানে ভোট কমেছে ৬২% থেকে ৪৬%-এ। এই সব ভোট ফিরেছে তৃণমূলের ভোট বাক্সে। সেই কারণে তৃণমূল রাজ্যের আদিবাসী অঞ্চলে অপ্রত্যাশিত ভাল ফল করেছে। যে দলিত শ্রেণীর প্রতি এবার প্রচুর আস্থা রেখেছিল বিজেপি, সেখানেও দেখা যাচ্ছে ২০১৯-এর তুলনায় ভোট অনেক কম।রাজবংশী ভোটেও বড় ধ্বস নেমেছে বিজেপির, ৭৫% থেকে কমে এসেছে ৬০%-এ। তবে এ কথা মানতে হবে যে রাজবংশী ভোট হারালেও বিজেপি তুলনামূলক ভাবে ভালো ফল করেছে উত্তরবঙ্গে। তার মানে অন্য শ্রেণীর মানুষ এবার বিজেপিকে বেশি ভোট দিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। দলিত ভোটের যে অংশটিকে বিজেপি এবার  কিছুটা হলেও ধরে রাখতে পেরেছে সেটি হল  মতুয়া সহ নমশূদ্রদের ভোটের একাংশ। তৃণমূলকে হারাতে গেলে বিজেপির দরকার ছিল ২০১৯-এর ভোটব্যাংক ধরে রাখার কাজটি মন দিয়ে করে যাওয়া, কিন্তু তাঁরা সে পথে হাঁটেন নি। 

হিন্দু উচ্চবর্ণের যে ভোট (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ,বৈদ্য ইত্যাদির) সেখানেও দেখা যাচ্ছে বিজেপির ভোট অনেক কমেছে। ২০১৯-এর ৫০%-,এর নিরিখে এবার ভোট কমে হয়েছে ৪৬%। তবে সমীক্ষা অনুযায়ী উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোটের এই হ্রাস যে তাঁদের বিজেপির প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন তা বলা ঠিক হবে না। কারণ দেখা যাচ্ছে যে বিজেপি  উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত হিন্দু ভোটের নিরিখে তৃণমূল অপেক্ষা প্রায় ১৩ থেকে ১৪% ভোটে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু নিম্নবিত্তের ভোটের নিরিখে তৃণমূল অনেকটা এগিয়ে রয়েছে বিজেপির তুলনায়, প্রায় ১৭ থেকে ১৮%। এই ভোটের পার্থক্য তৃণমূলকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। আসলে বিজেপি মুখে আমরা গরিবের সরকার, বড়লোকের যম, ইত্যাদি বলে বড়লোকদের টাইট করার জন্য নোটবন্দি করলাম, এ রকম একটা ভাব দেখিয়ে, শুরুর দিকে খানিকটা গরিবের কাছে আসার চেষ্টা করেছিল। তার সুফল তারা এই রাজ্যে তুলেছিল ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে। যদিও সেই ভোটে বামের ভোট ঢেলে গিয়েছিল রামের বাক্সে, তা না হলে ওই ফল বিজেপি করতে পারত না। ক্রমেই নীল শেয়ালের গায়ের রং উঠতে শুরু করল, গরিবের সরকারের প্রকৃত রূপ কি তা ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করলো। একদিকে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি অন্যদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আস্ফালনে বিরক্ত মানুষের সামনে মুখোশ আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছিল। এ রাজ্যে এসে অমিত শাহরা যতই দলিতদের মাথায় হাত বুলিয়ে ভোট টানার চেষ্টা করুন না কেন, দলিতদের মনে ছিল সারা ভারত জুড়ে দলিতদের উপর কি ধরণের অত্যাচার করেছে এই বিজেপি সরকার। দলিত লাইফ ম্যাটার্স - সেই স্লোগান ও আন্দোলন কি মিথ্যা হতে পারে? দলিতরা তাই সমুচিত জবাব দিয়েছেন ভোট বাক্সে।রাজবংশীরাও মিলিটারিতে নারায়ণী সেনা হতে চায়নি তা বোঝাই যাচ্ছে। নিম্নবর্গের কাছে বিজেপির স্বরূপ সবটা উন্মোচিত হয়েছে লকডাউনের পর।গরিব মানুষগুলোকে পথে বসিয়ে ছেড়েছে এই বিজেপি সরকার। পরিযায়ী শ্রমিকদের যে বিপুল অংশ এই বাংলায় ফিরেছেন, তাঁদের বেশ কয়েক পুরুষ আর বিজেপিকে ভোট দেওয়ার নামগন্ধ করবেন না, এতটাই তারা ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা ও অমানবিকতার প্রতি।মতুয়াদের জন্য বিজেপির খুড়োর কল ছিল, নাগরিকত্ব। তা দেশের নাগরিক না হয়ে কি ভোট দেওয়া যায় নাকি? এই প্রশ্নের উত্তর স্থানীয় বিজেপি নেতারা দিতে পারেননি, ফলে অমিত শাহ - মোদি হাত পা নেড়ে কি বললেন তাতে কিচ্ছু এসে যায় নি। উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত হিন্দুর জন্য বিজেপির দাওয়াই ছিল, দেশভাগের স্মৃতি উস্কে দেওয়া। বিজেপি নেতা, নেত্রীরা যদি দেশভাগ নিয়ে বাঙালি যত গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, এমনকি ইতিহাস লিখেছে সেগুলোর দিকে একটু নজর দিতেন, তা হলে দেখতে পেতেন দেশভাগ নিয়ে মানুষের মনে কোনও মুসলমান বিদ্বেষ নেই, আছে শুধুই নস্টালজিয়া। 

কেন নেই মুসলমান বিদ্বেষ ? সেই অপার ক্ষমা হয়ত বাংলার রেনেসাঁর উত্তরাধিকার, যা বহন করেছেন বাংলার ভোটাররা। আর একটা কথা, দেশভাগের যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ, তাকে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়েছিল বামপন্থীদের শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব। সাম্প্রদায়িকতার কড়াল গ্রাস থেকে বাংলাকে উদ্ধারে এক বড় অবদান বামপন্থীদের রয়েছে। একথা অস্বীকার করলে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে।অতি সম্প্রতি বিজেপির এক তাত্বিক নেতা, তাঁর ইংরেজি কলামে লোকনীতির এই সমীক্ষার এক সম্পুর্ন উল্টো ব্যাখ্যা করেছেন, যা থেকে স্পষ্ট যে হিন্দুত্ববাদীরা বাংলায় সামাজিক শেকড় গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাঁরা এবার ধীরগতিতে এক আদর্শগত লড়াই বাংলার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দেওয়ার মতলব করছেন। লম্বা দৌড়ে এই আদর্শগত লড়াইয়ের মোকাবিলা করার জন্য, শুধু জনমুখী প্রকল্প যথেষ্ট নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের এই মুহূর্তে কোনও আদর্শগত ম্যানিফেস্টো মানুষের সামনে নেই। এই লড়াইকে শুধু জয় শ্রীরাম আর জয় বাংলার বাইনারিতে ভাবলে মস্ত ভুল হবে।বিজেপি টের পেয়ে গেছে যে উত্তর ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ, বাংলায় চলবে না। ফলে এখন চৈতন্য, বঙ্কিম, বিবেকানন্দের আগ মার্কা হিন্দু জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে বাংলার উপর ঝাঁপানোর নীল নকশা বিজেপির হাতে তৈরি। তাকে প্রতিহত করার নীল নকশা কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?

Thursday, May 13, 2021

করোনা অতিমারি কি একটি দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে - কিছু ঐতিহাসিক দলিল ও অন্যান্য

 লিখেছে

চ ন্দ ন দে ব না থ 

Source: Foreign Policy(Article by Kyle Harper)

এই সময়টাতে সব থেকে বেশি দরকার ছিল সমাজ জুড়ে ভাইরাস-বিরোধী ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা। অন্যদিকে এটাও আবার ঘটনা যে শ্রেণিবিভক্ত ও প্রতিযোগিতা নির্ভর এই সমাজে এরকম ঐক্য ও সহযোগিতা আশা করাটাও বোকামি। যদিও সমাজে অন্যান্য লড়াই বা যুদ্ধগুলো থেকে এটা একেবারেই আলাদা এই দিক থেকে যে, হামলাকারী ভাইরাস মানব সমাজের কোনও অংশ নয়; এটা হল ভাইরাস নামক একটা প্রাকৃতিক শক্তির সাথে গোটা সমাজের লড়াই। এবং ভাইরাসের কাছেও তো কোনও বাছবিচার নেই; সে জানে না, পরোয়াও করে না, মানব সমাজে শোষক কারা আর শোষিত কারা, কে ধনী আর কে গরীব। ভাইরাস এটাও জানে না যে ভারত ও পাকিস্তান নামক এই গ্রহের দুটো ভূখণ্ড একটা সীমারেখা দ্বারা বিভক্ত এবং একইভাবে গোটা গ্রহটাই। ভাইরাস কোনও বর্ডার জানে না। সে বোঝে না, চেষ্টাও করে না, একটা মানুষ ব্রিটিশ নাকি আফ্রিকান, তার চামড়া তামাটে নাকি সাদা। অর্থাৎ সমস্ত দিক থেকেই ভাইরাসের কাছে আমরা সবাই একই, অভিন্ন। 

শুধু এটাই যদি বাস্তব হতো এতোটা দুর্দশা নিশ্চয়ই আমাদের হতো না। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, ভাইরাসের কাছে আমরা অভিন্ন হলেও আর্থ-সামাজিক দিক থেকে মোটেই নই। সেই কারণে ভাইরাসজাত অতিমারি ও দুর্দশাও সমাজের সমস্ত অংশের কাছে মোটেই সমমানের নয় বরং সেখানেও আছে বৈষম্যের প্রকট প্রতিফলন, বিশেষ করে লকডাউনের সময়ে যেটা দেখা গেছে। অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউটাতেও সেই একই সত্যের প্রকাশ যথেষ্ট স্পষ্ট। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল অক্সিজেনের অভাবে নিকটজনের মৃত্যুজনিত ক্ষোভ চিকিৎসক বা নার্সদের ওপরে আছড়ে মতো ঘটনা। কারণ সবাই বোঝে গাফিলতিটা সরকারের, চিকিৎসক বা নার্সদের নয়; বিগত এক বছরেরও বেশি সময় জুড়ে ভাইরাস বিরোধী লড়াইয়ে একেবারে সামনের সারিতে যাঁরা আছেন তাঁরা হলেন ঐ চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরাই। 

অতীতের কিছু মহামারিতেও চিকিৎসকদের ওপরে আক্রমণ হতে দেখা গেছে, যেমন উনবিংশ শতকের কলেরা রায়টগুলোতে। অবশ্য আজকের কয়েকটা বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনাকে মোটেই “রায়ট” আখ্যা দেওয়া চলে না। আক্রমণের রূপ, তীব্রতা ও ব্যাপ্তির দিক থেকে উনবিংশ শতকের ঘটনাগুলো ছিল অনেক আলাদা। সেগুলো ছিল অনেক বেশি হিংস্র, মানুষের অংশগ্রহণের দিক থেকে অনেক বড় মাপের, আর ব্যাপ্তির দিক থেকে ছিল গোটা ইউরোপ জুড়ে এবং রাশিয়াতে। এতো বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও কিছু মিলের জায়গাও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে সেটা বুঝতে আরও সুবিধা হবে যদি মধ্য যুগের ‘ব্ল্যাক ডেথ’কে (ব্যুবনিক প্লেগ) কেন্দ্র করে পরিচালিত হিংসাত্মক ঘটনাগুলোর সাথে কলেরা রায়টগুলোর পার্থক্যকে আমরা বোঝার চেষ্টা করি।   

Source: National Army Museum(UK)

 

প্রথমত, ইউরোপের সমস্ত জায়গা, এবং রাশিয়াতেও, কলেরা রায়টগুলো পরিচালিত হয়েছিল মূলত শহুরে শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষদের দিক থেকে। অনেক জায়গাতে গ্রামের গরীবেরাও এগুলোতে অংশ নিয়েছিল। এক কথায় বললে, রায়টগুলো হয়েছিল সমাজের শোষিত-নিপীড়িত বর্গের গরীব মানুষদের দিক থেকে। সেই অর্থে, রায়টগুলোর একটা স্পষ্ট শ্রেণি  চরিত্র ছিল। সেটা হয়তো এই কারণে যে মহামারিতে মৃত্যু ঘটছিল মূলত সমাজের এই অংশের মধ্যেই। আর প্রচণ্ড হিংসাত্মক হয়ে ওঠার পেছনে এই সত্যটা হয়তো বিশেষ ভাবে কাজ করেছিল যে ব্যাপক ভাবে মৃত্যু ঘটছিল শিশুদের; এবং সেই কারণেই হয়তো রায়টগুলোতে বিরাট অংশগ্রহণ ছিল, এমনকী সামনের সারিতেও, মহিলাদের। ব্ল্যাক ডেথকে কেন্দ্র করে হওয়া হিংসাত্মক ঘটনাগুলোর এরকম সুস্পষ্ট শ্রেণি  চরিত্র কিন্তু ছিল না। তবে আরও স্পষ্ট বৈসাদৃশ্যের দিক ছিল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুর প্রশ্নে। ব্ল্যাক ডেথের ক্ষেত্রে, ইউরোপের সমস্ত জায়গাতেই আক্রমণ হয়েছিল মূলত ইহুদী সম্প্রদায়ের ওপরে, অনেক ক্ষেত্রে আবার কুষ্ঠ রুগীদের ওপরেও। আর কলেরা রায়টগুলোতে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল চিকিৎসক ও নার্স সহ চিকিৎসা ব্যবস্থা (হাসপাতাল) এবং আনুষঙ্গিক সরকারী আমলা ও  পুলিশ।

Source: National Army Museum(UK)


এই দুই বৈসাদৃশ্য ছাড়াও, ঘটনাগুলোর সূত্রপাতের প্রশ্নে একটা সাদৃশ্য কিন্তু ছিল। দুই ক্ষেত্রেই কাজ করেছিল এই সন্দেহ যে “শত্রুপক্ষ” পরিকল্পনা করেই, হয়তো বিষক্রিয়ার দ্বারা, তাদের মধ্যে মৃত্যুলীলা ঘটিয়ে চলেছে। ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ নগরীগুলোতে বীভৎস কলেরা রায়ট শুরু হওয়ার পেছনে এই সন্দেহ কাজ করেছিল যে গরীব শ্রমজীবীদের মধ্যে এই মৃত্যু মিছিল আসলে তাদের  জনসংখ্যা কমানোর মতলবে এলিট সম্প্রদায়ের কোনও পরিকল্পনা মাফিক, যেখানে চিকিৎসক, নার্স ও সরকারী আমলারা এজেন্ট হিসাবে কাজ করে চলেছে। বস্তুত, মাত্র ত্রিশ বছর আগেই প্রকাশিত হয়েছিল থমাস ম্যালথাসের সেই কুখ্যাত রচনা “An Essay on the Principle of Population”,  যেখানে শ্রমিক শ্রেণি কে নিন্দা করা হয়েছে তাদের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলার জন্য। গোটা উনবিংশ শতক জুড়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও এই তত্ত্বের যথেষ্ট আধিপত্য ছিল, এবং তার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল গোটা ইউরোপ জুড়েই। শাসক শ্রেণি র দিক থেকে কথা বলা হচ্ছিল দারিদ্র্য কমাতে গৃহীত কর্মসূচিগুলো গরীবদের আলস্যে উৎসাহ জোগাচ্ছে, তারা কাজ না করে উল্টে জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। ১৮৩৪ সালে, ব্রিটেনে এমনকী আইন সংশোধনও করা হয়েছিল (Poor Law Amendment Act) এই মর্মে যে কাজ না করলে রিলিফ দেওয়া হবে না।   

দাঙ্গাগুলোর পেছনে আরও কিছু সন্দেহ কাজ করেছিল, যেমন এই সন্দেহ যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রুগীদের চিকিৎসকরা আসলে মেরে ফেলতে চাইছে মৃতদেহগুলো অ্যানাটমিক্যাল স্কুলগুলোতে বেচে দেওয়ার মতলবে। এই সন্দেহ তৈরি হওয়ার একটা  কারণও অবশ্য ছিল। রায়ট শুরু হওয়ার মাত্র তিন বছর আগে দুটো লোক সত্যিই অভিযুক্ত হয়েছিল ১৬ জনকে খুন করে তাদের বডিগুলো একজন চিকিৎসককে তাঁর অ্যানাটমি লেকচারের কাজে বেঁচে দেওয়ার অভিযোগে। এই ব্যাপারে চলমান মামলার খবরাখবর সংবাদপত্রগুলোতে নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছিল, যেগুলো রায়ট শুরু হওয়ার সময়ে মানুষের মনে টাটকা অবস্থাতেই ছিল। তাছাড়া কর্তৃপক্ষও যেহেতু মৃতদের খুব দ্রুতই কবর দিয়ে দিচ্ছিল সম্পূর্ণ আলাদা একটা জায়গাতে, সেটাও গরীব মানুষের কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। তাছাড়া এই অভিযোগও তাদের ছিল যে মৃতদের সম্মানজনক ভাবে কবর দেওয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়ে, হাসপাতালগুলো তাদের চোখে আসলে “মৃত্যুর কারখানা” বলেই মনে হচ্ছিল, এবং সেই কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরে হিংস্র আক্রমণ ছাড়াও রুগীদের হাসপাতাল থেকে বের করে এনে “মুক্ত” করে দেওয়ার মতো ঘটনাও অনেক ছিল।   

রাশিয়াতে হওয়া রায়টগুলো ছিল আরও হিংস্র। সেখানেও এই সন্দেহ বিরাট ভাবে কাজ করেছিল যে গরীব মানুষের জনসংখ্যা ছেটে ফেলার মতলবে জলের কুয়োগুলোতে আসলে বিষ মেশানো হয়েছে। কোয়ারান্টিন ভেঙ্গেচুরে ক্ষুব্ধ জনতা বিশাল সংখ্যায় রক্তাক্ত দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছিল। হাসপাতাল তছনছ করা, এ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করা ইত্যাদি ছাড়াও শুরু হয়ে হয়েছিল ডাক্তারদের হত্যা করার এক উন্মাদনা। বিশাল সংখ্যায় আক্রমণ চালানো হচ্ছিল ধনী মানুষদের বাড়ীগুলোতেও। 

সেই একবারই নয়, এরপরেও রাশিয়াতে কলেরা রায়ট হয়েছে - যেমন ১৮৯২ সালে, যখন সেই দাঙ্গা দমনে জার স্বৈরতন্ত্র সেনাবাহিনী নামিয়েছিল। ঐ একই সময়ে কলেরা রায়ট চিনেও হয়েছে, মূলত সেইসব শহুরে এলাকাতে যেখানে ছিল তখনকার  ঔপনিবেশিক শাসক বর্গের বসবাস, যাদের চোখে চাইনীজরা ছিল কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণি র নাগরিক। সেই কারণে সেখানেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল ঐ এলাকাগুলোতে থাকা পশ্চিমী দুনিয়ার মানুষেরাই। তাদেরও অভিযুক্ত করা হয়েছিল কুয়োর জলে বিষ মেশানোর অভিযোগে।

Source: Foreign Policy(Article by Kyle Harper)


সমস্ত দিক বিচার করা হলে, উনবিংশ শতকের কলেরা রায়টগুলো তাদের অন্তর্বস্তুর দিক থেকে ছিল আসলে শোষক-শাসক বর্গের বিরুদ্ধে শোষিত-শাসিতের দীর্ঘ দিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভেরও এক বহিঃপ্রকাশ। এবং এটাও ঘটনা যে ঐ শতকের প্রথম দিক থেকেই ইউরোপে শ্রেণি  সংগ্রামের একটা জোরালো স্রোত জারি ছিল, যেটা ক্রমাগত আরও জোরালো হয়ে ওঠার দিকে এগোতে চাইছিল। কলেরা রায়টগুলোকে সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাও সেই কারণে ঠিক হবে না। তবে এই কথা বলার অর্থ মোটেই এটা নয় যে রায়টগুলো খুব ভালো কাজ ছিল বা ঐতিহাসিক ভাবে প্রগতিশীল কাজ ছিল। একই ভাবে, আজকের অতিমারির সময়েও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের ওপরে খুব বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত আকারে হলেও যেসব আক্রমণ হয়েছে সেগুলো মোটেই ভালো কাজ হয়নি, বিশেষ করে যখন অতিমারি কী থেকে সেটা মানুষ জানে, যেটা ১৮৩০-এর দশকের কলেরা রায়টগুলোর সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও জানা ছিল না। কলেরা সৃষ্টিকারী জীবাণু (cholera bacillus) আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক পরেঃ প্রথম আবিষ্কারক ছিলেন (১৮৫৪ সালে) এক ইতালীয় বিজ্ঞানী, ফিলিপো পাসিনি; নিশ্চিত ভাবে আবিষ্কৃত হওয়ার স্বীকৃতি পাওয়া গিয়েছিল আরও অনেক পরে (১৮৮৩ সালে), ইতিহাস খ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কোচের এক অনুসন্ধানে পাওয়া আবিষ্কার থেকে। তবে রোগটা যে শহরের দূষিত জল থেকে হচ্ছে সেটা অনেক আগেই (১৮৪৯ সালে) আবিষ্কার করেছিলেন এক ব্রিটিশ চিকিৎসক, জন স্নো। সুতরাং চিকিৎসা বিজ্ঞানেই যখন জানা ছিল না রোগটা কী থেকে ও কীভাবে হচ্ছে, যখন রোগের “মায়াজমা তত্ত্ব” চিকিৎসাবিদ মহলে তখনও প্রধান জায়গাতে, সেরকম একটা সময়ে সাধারণ গরীব মানুষ স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের ওপরে মারমুখী হওয়া আর এখন অক্সিজেন না পেয়ে রুগীর মৃত্যু হওয়ার জন্য চিকিৎসকদের আক্রমণ করার মধ্যে নিঃসন্দেহে অনেক তফাৎ। মিলের দিক আছে একটা অন্য জায়গাতেঃ কলেরা রায়টগুলোর পরোক্ষ অবদান হিসাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অগ্রগতি শুরু হওয়া, যেটা আজকের ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ চাহিদা। আরেকটা মিলের দিক হল, আজকের ঘটনাগুলোও আসলে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধেই পরিচালিত; সম্পূর্ণ অসংগঠিত ও অসহায় অবস্থায় ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে হাতের কাছে পাওয়া চিকিৎসকদের ওপরে, আসলে যেগুলো সরকার এবং সেই অর্থে শাসক শ্রেণিরই বিরুদ্ধে।



[ন্দন দেবনাথ, বিজ্ঞানসাধক ও মননে আপামর তথ্য ও 
তত্ত্বভিত্তিক সত্যনিষ্ঠ । মনোজ্ঞ বিশ্লেষণেই তাঁর মূল আগ্রহ । প্রকাশিত হয়েছে নানা বই । সাম্প্রতিকতম বইটি ই-বুক 
আকারেও প্রকাশিত । নিচের লিংক থেকে কিনে নিতে পারেন পাঠক ।]